সাগরের বুকে হারিয়ে যাওয়া আকাশের রানি: ৮৯ বছরেও মেলেনি এমেলিয়া এয়ারহার্টের খোঁজ

প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়েছিলেন তিনি; শেষ রেডিও বার্তার পর আর কোনোদিন শোনা যায়নি তার গলা

ফিচার ডেস্ক: ১৯৩৭ সালের ২ জুলাই, সকাল দশটা। পাপুয়া নিউগিনির লে বিমানঘাঁটি থেকে আকাশে উঠল রুপালি রঙের একটি লকহিড ইলেক্ট্রা বিমান। চালকের আসনে এমেলিয়া এয়ারহার্ট — তখন বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত নারী পাইলট। পাশে নেভিগেটর ফ্রেড নুনান। সামনে ২ হাজার ৫৫৬ মাইল (প্রায় ৪ হাজার ১১৩ কিলোমিটার) খোলা প্রশান্ত মহাসাগর, আর তার ঠিক মাঝখানে মাত্র দুই মাইল লম্বা একটা ক্ষুদ্র প্রবালদ্বীপ — হাউল্যান্ড। সেখানেই জ্বালানি নিয়ে আবার উড়াল দেওয়ার কথা।

কিন্তু এয়ারহার্ট আর কোনোদিন পৌঁছাননি। বিমান, পাইলট, নেভিগেটর — তিনটাই মিলিয়ে গেল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রহস্যের একটিতে।

যে নামটা রেকর্ডে লেখা

এয়ারহার্টের খ্যাতি তখন আকাশছোঁয়া। ১৯৩২ সালে তিনি প্রথম নারী হিসেবে একা, বিরতিহীনভাবে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেন — সেই কৃতিত্বে মার্কিন কংগ্রেস তাকে দেয় ‘ডিসটিংগুইশড ফ্লাইং ক্রস’। ১৯৩৫ সালে হনলুলু থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত একা ওড়েন — এই পথে তিনিই প্রথম মানুষ। সংবাদপত্র তাকে ডাকত ‘আকাশের রানি’ বলে।

তবু তার স্বপ্ন থামেনি। ১৯৩৭ সালে তিনি বের হলেন ইতিহাসের সবচেয়ে লম্বা বিশ্বভ্রমণে — বিষুবরেখা ঘেঁষে প্রায় ২৯ হাজার মাইল (৪৭ হাজার কিলোমিটার) পথ। ১ জুন মিয়ামি থেকে যাত্রা শুরু করে দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পেরিয়ে ২৯ জুন তিনি পৌঁছান লে-তে। ততদিনে পেরিয়ে গেছে ২২ হাজার মাইল। বাকি মাত্র ৭ হাজার — কিন্তু সেই বাকিটুকুই ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর, পুরোটাই খোলা সাগরের ওপর দিয়ে।

শেষ উড়াল

হাউল্যান্ড দ্বীপ এত ছোট যে আকাশ থেকে খুঁজে পাওয়াই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সাহায্যের জন্য দ্বীপের কাছে অপেক্ষা করছিল মার্কিন কোস্ট গার্ডের জাহাজ ‘ইটাস্কা’। পরিকল্পনা ছিল, রেডিওতে কথা বলে জাহাজ তাকে পথ দেখাবে।

কিন্তু শুরু থেকেই গন্ডগোল। ইটাস্কা বারবার বার্তা পাঠালেও এয়ারহার্ট সম্ভবত সেগুলো শুনতে পাচ্ছিলেন না; আবার তিনি নিজে মোর্স কোডে দক্ষ ছিলেন না — দ্বিমুখী যোগাযোগ আর প্রতিষ্ঠা হলো না কোনোদিন। ভোরের দিকে তার গলা শোনা যেতে থাকে, ক্রমশ জোরালো হচ্ছে সংকেত — মানে তিনি খুব কাছেই আছেন। সকাল ৭টা ৪২ মিনিটে আসে সেই বিখ্যাত বার্তা: “আমাদের ঠিক ওপরেই থাকার কথা, কিন্তু তোমাদের দেখতে পাচ্ছি না। জ্বালানি কমে আসছে। রেডিওতে তোমাদের ধরা যাচ্ছে না।”

সকাল ৮টা ৪৩ মিনিটে শেষবারের মতো শোনা যায় তার গলা: “আমরা উত্তর-দক্ষিণ রেখা ধরে ছুটছি।”

তারপর — নীরবতা। চিরদিনের জন্য।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় খোঁজ

প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের নির্দেশে শুরু হয় তৎকালীন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আকাশ-সাগর অনুসন্ধান। টানা ১৬ দিন ধরে ৭টি যুদ্ধজাহাজ আর অসংখ্য বিমান চষে ফেলে প্রায় ২ লাখ ৬২ হাজার বর্গমাইল সাগর। ফল — শূন্য। না বিমানের টুকরো, না তেলের ছোপ, না কোনো মানুষের চিহ্ন। ১৯ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের ‘সাগরে হারিয়ে গেছে’ ঘোষণা করা হয়।

মার্কিন সরকারের আনুষ্ঠানিক মত আজও একই: জ্বালানি শেষ হয়ে বিমানটি হাউল্যান্ডের কাছাকাছি কোথাও সাগরে ভেঙে পড়ে ডুবে গেছে। কিন্তু প্রমাণ? এক টুকরো ধ্বংসাবশেষও আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

হাড়, জুতা আর একটা বাক্স

এর ঠিক উল্টো একটা তত্ত্বের কেন্দ্র হাউল্যান্ড থেকে প্রায় ৪০০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বের জনশূন্য দ্বীপ নিকুমারোরো। এই মতের অনুসারীদের দাবি, দ্বীপ খুঁজে না পেয়ে এয়ারহার্ট জরুরি অবতরণ করেছিলেন এই দ্বীপের প্রবাল প্রাচীরে, এবং সেখানেই প্রাণ হারান তিনি।

১৯৪০ সালে ওই দ্বীপে পাওয়া গিয়েছিল মানুষের কঙ্কাল, নারীদের জুতার অংশ আর বিমানে ব্যবহৃত নেভিগেশন যন্ত্রের (সেক্সট্যান্ট) একটা খালি বাক্স। ফিজির এক চিকিৎসক তখন হাড়গুলো পুরুষের বলে রায় দিয়েছিলেন; পরে হাড়গুলোই হারিয়ে যায়। কিন্তু ২০১৮ সালে মার্কিন নৃবিজ্ঞানী রিচার্ড জ্যান্টজ পুরোনো পরিমাপগুলো আধুনিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করে বলেন, হাড়গুলো এয়ারহার্টের গড়নের সঙ্গেই বেশি মেলে। তবে এই গবেষণা নিয়েও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক থামেনি — হাড় হাতে না থাকলে নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই।

যতবার আশা, ততবার ধোঁকা

রহস্যটা শেষ হয়েও শেষ হয় না। টাইটানিকের খোঁজকারী বিখ্যাত সমুদ্রবিজ্ঞানী রবার্ট ব্যালার্ড ২০১৯ সালে নিকুমারোরোর চারপাশের গভীর সাগর তল্লাশি করে খালি হাতে ফেরেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ‘ডিপ সি ভিশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান হাউল্যান্ড থেকে ১০০ মাইল দূরে সোনারে পাওয়া বিমান-আকৃতির ছবি দেখিয়ে বিশ্বজুড়ে শিরোনাম করে — কিন্তু সে বছর নভেম্বরে নিজেরাই জানায়, ওটা ছিল আসলে প্রাকৃতিক পাথরের স্তূপ।

সবশেষে এই ২০২৬ সালের অক্টোবরেও নতুন অভিযান গেছে নিকুমারোরোতে — স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা একটা সন্দেহজনক আকৃতি পরীক্ষা করে দেখা গেছে সেটা গাছের ধ্বংসাবশেষ। অর্থাৎ মৃত্যুর ৮৯ বছর পর, প্রযুক্তির এই যুগেও, পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত মানুষটির শেষ পরিণতি আজও অজানা।

শেষ হয়েও শেষ নয়

এমেলিয়া এয়ারহার্ট একবার লিখেছিলেন, “সাহস হলো সেই মূল্য, যা জীবন শান্তির বিনিময়ে চায়।” তার নিজের গল্পটা যেন সেই কথারই প্রমাণ — সব রেকর্ড, সব খ্যাতি পেছনে ফেলে তিনি হারিয়ে গেলেন সেই সাগরের বুকে, যার ওপর দিয়ে একদিন পুরো পৃথিবীটাকে একবার ঘুরে আসতে চেয়েছিলেন।

আকাশ হয়তো তার সব প্রশ্নের উত্তর জানে। আমরা জানি শুধু ওই শেষ বার্তাটা — “আমরা উত্তর-দক্ষিণ রেখা ধরে ছুটছি।”

— ফিচার ডেস্ক

তথ্যসূত্র: স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়াম, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, মার্কিন নৌ-বিমান জাদুঘরের নথি এবং সমসাময়িক অভিযান-প্রতিবেদন।

ছবির ক্যাপশন (পোর্টালের জন্য): লকহিড ইলেক্ট্রা বিমানের সামনে এমেলিয়া এয়ারহার্ট, ১৯৩৭। ছবি: সংগৃহীত (পাবলিক ডোমেইন)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ জাতীয় আরো খবর..

ফেসবুকে আমরা