-
- জাতীয়
- গ্রিসে ফেরার এক সপ্তাহের মাথায় সড়ক দু’র্ঘট’নায় প্রা’ণ গেল নবীগঞ্জের সিজানের
- আপডেট টাইম : October, 12, 2026, 3:16 pm
- 1 বার
নবীগঞ্জ ( হবিগঞ্জ) থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা :: যে মানুষটি কয়েক দিন আগেও প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটিয়েছেন হাসি,আনন্দের মুহূর্ত, বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন কর্মস্থলে, সেই মানুষটির আর কখনো বাড়ি ফেরা হবে না। পরিবারের জন্য সুখের দিন ফিরিয়ে আনতে হাজার মাইল দূরে প্রবাসজীবন বেছে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে প্রিয়জনদের কাছে ফিরে আসার বদলে এলো তাঁর মৃ’ত্যুর সংবাদ।
বাবার স্নেহের অপেক্ষায় থাকা আট বছরের শিশুটি এখনো হয়তো জানে না, তার জীবনের সবচেয়ে নির্ভরতার মানুষটি আর কোনো দিন তাকে বুকে জড়িয়ে ধরবেন না। এমনই এক হৃদয়বিদারক ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার বৈঠাখাল গ্রামে।
গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে সড়ক দু’র্ঘটনায় প্রা’ণ হারিয়েছেন সিজান মিয়া (৩৫) নামের এক বাংলাদেশি প্রবাসী। দেশে ছুটি কাটিয়ে গ্রিসে ফিরে যাওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁর এমন ম’র্মান্তিক মৃ’ত্যুতে শোকাহত হয়ে পড়েছেন পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও এলাকাবাসী। প্রিয়জনকে হারিয়ে দিশেহারা পরিবারটি এখন তাঁর ম’রদে’হ দেশে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষায় রয়েছে।
নিহত সিজান মিয়া নবীগঞ্জ উপজেলার ১০ নম্বর দেবপাড়া ইউনিয়নের বৈঠাখাল গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ওই গ্রামের মৃত মানিক মিয়ার ছেলে।
পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি এবং স্বজনদের মুখে হাসি ফোটানোর আশায় ২০১৯ সালে গ্রিসে পাড়ি জমান সিজান। প্রবাসের কঠিন জীবন ও প্রতিকূলতার সঙ্গে ল’ড়াই করে পরিবারের জন্য উপার্জন করছিলেন তিনি। দূরদেশে থাকলেও পরিবারের প্রতি তাঁর টান ছিল গভীর। স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটানোর প্রত্যাশা নিয়ে সম্প্রতি দেশে ছুটিতে এসেছিলেন তিনি।
ছুটি শেষে গত ৩ অক্টোবর গ্রিসের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন সিজান। পরদিন ৪ অক্টোবর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর শেষবারের মতো কথা হয়। সে সময় তিনি গ্রিসে পৌঁছানোর কথা জানিয়েছিলেন। এরপর থেকে তাঁর সঙ্গে পরিবারের আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।
প্রথম দিকে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও পরে গ্রিসে থাকা তাঁর পরিচিত ব্যক্তিরাও সিজানের কোনো খোঁজ পাচ্ছিলেন না। পরিবারের সদস্যরা বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারেননি। একপর্যায়ে গ্রিসে অবস্থানরত পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে তাঁরা সিজানের মৃ’ত্যুর খবর জানতে পারেন। প্রিয়জনের এমন আকস্মিক মৃ’ত্যুসংবাদে পরিবারে নেমে আসে শোকের মাতম।
এথেন্সে ঠিক কী পরিস্থিতিতে সড়ক দু’র্ঘটনাটি ঘটেছে, তা নিয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। দুর্ঘটনার সময় সিজান কোথায় যাচ্ছিলেন কিংবা কীভাবে দু’র্ঘটনার শিকার হলেন, সে সম্পর্কেও নিশ্চিত কোনো তথ্য পরিবারের কাছে নেই।
স্বজনেরা এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে দু’র্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার পূর্ণ বিবরণ জানা সম্ভব হয়নি।
সিজানের চাচাতো ভাই ইসমাইল জানান, গ্রিসে থাকা পরিচিত ব্যক্তিদের কাছ থেকেই তাঁরা সিজানের মৃ’ত্যুর খবর পেয়েছেন। দু’র্ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানার জন্য তাঁরা অপেক্ষা করছেন। সোমবার দূতাবাসের মাধ্যমে এ বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করছেন তাঁরা।
সিজানের মৃ’ত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তাঁর ম’রদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, ম’রদেহ দেশে আনার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পরিবারের পক্ষ থেকে অনুমতিপত্র দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
পরিবারের সদস্যদের আশা, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হলে তাঁরা শেষবারের মতো প্রিয়জনের মুখ দেখতে পারবেন এবং নিজ গ্রামের মাটিতে তাঁকে দাফন করার সুযোগ পাবেন।
এদিকে সিজানের মৃ’ত্যুতে তাঁর পরিবারের ওপর নেমে এসেছে অপূরণীয় ক্ষতি। বিশেষ করে আট বছর বয়সী ছেলেকে রেখে তাঁর চলে যাওয়া স্বজনদের হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। যে সন্তানের বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ সুন্দর করার স্বপ্ন নিয়ে একজন বাবা প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করছিলেন, সেই সন্তানের জীবনেই নেমে এলো বাবাহীনতার কঠিন বাস্তবতা।
বাবার স্নেহ, ভালোবাসা ও অভিভাবকত্ব থেকে বঞ্চিত হতে হলো শিশুটিকে। আর পরিবারের অন্য সদস্যদের সামনে এখন প্রিয় মানুষটিকে হা’রানোর বেদনার পাশাপাশি তাঁর ম’রদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষা।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল সালাম সিজানের মৃ’ত্যুর খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, সিজানের মৃ’ত্যুর সংবাদ শুনে তাঁরা ম’র্মাহত। ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা চলছে।
সিজানের মৃ’ত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বৈঠাখাল গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় শোকের আবহ বিরাজ করছে। পরিচিতজনদের কাছে তিনি ছিলেন পরিবারের জন্য সংগ্রাম করে যাওয়া একজন প্রবাসী। তাঁর এমন আকস্মিক মৃ’ত্যুতে স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা গভীরভাবে শোকাহত।
জীবিকার সন্ধানে দেশ ছেড়ে যাওয়া সিজান হয়তো ভেবেছিলেন, প্রবাসের পরিশ্রম একদিন তাঁর পরিবারের মুখে স্থায়ী হাসি ফোটাবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথেই থেমে গেল তাঁর জী’বনযাত্রা। রেখে গেলেন স্ত্রী-সন্তান ও স্বজনদের জন্য এক দীর্ঘশ্বাসভরা শূ’ন্যতা।
এখন পরিবারের সবার একটাই প্রত্যাশা,দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সিজানের ম’রদে’হ দেশে ফিরিয়ে আনা হোক। প্রিয়জনের শেষ বিদায়ে অংশ নিয়ে তাঁকে নিজ গ্রামের মাটিতে চি’রনিদ্রায় শা:য়িত করতে চান স্বজনেরা।
এ জাতীয় আরো খবর..
Leave a Reply