দুই লাখ ডলার নিয়ে আকাশে ঝাঁপ, তারপর ৫৫ বছর ধরে নিখোঁজ!

ডি. বি. কুপার — আমেরিকার ইতিহাসের একমাত্র অমীমাংসিত বিমান ছি’নতাইয়ের রহস্যমানব।

একজন মানুষ সবার চোখের সামনে বিমানে উঠলেন, মুক্তিপণ নিলেন, তারপর লাফ দিলেন আকাশ থেকে। তার নাম, চেহারা, গলার স্বর — অনেক কিছুই জানা গেছে। শুধু জানা যায়নি একটাই জিনিস: তিনি আসলে কে ছিলেন, আর লাফের পর তার কী হলো।

ফিচার ডেস্ক :

ইতিহাসে এমন অ’পরাধী খুব কমই আছে, যে অ’পরাধ করেছে প্রকাশ্যে, শত শত মানুষের চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে গেছে, তদন্তকারীদের হাতে ছেড়ে গেছে নিজের ব্যবহার করা জিনিসপত্র — অথচ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী তদন্ত সংস্থা এফবিআই তার নামটাই জানতে পারেনি। তিনি ডি. বি. কুপার। ১৯৭১ সালের এক ঝড়ের রাতে চলন্ত বিমানের পেছনের দরজা দিয়ে টাকার ব্যাগ নিয়ে লাফ দিয়েছিলেন তিনি। তারপর — হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া। না লাশ, না প্যারাসুট, না মানুষটা।

সেই সন্ধ্যা

১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর, থ্যাংকসগিভিং উৎসবের আগের দিন। যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন অঙ্গরাজ্যের পোর্টল্যান্ড বিমানবন্দর। কালো স্যুট, সাদা শার্ট, কালো টাই আর রেইনকোট পরা মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক কাউন্টারে এসে সিয়াটলের একমুখী টিকিট কাটলেন। নাম বললেন — ড্যান কুপার। সেসময় পরিচয়পত্র দেখানোর কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। হাতে কালো ব্রিফকেস, আচরণে অস্বাভাবিক কিছুই নেই। নগদে টিকিটের দাম দিয়ে তিনি উঠে বসলেন নর্থওয়েস্ট ওরিয়েন্ট এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৩০৫-এ, বোয়িং ৭২৭ বিমানের একদম পেছনের সিটে।

বিমান আকাশে ওড়ার পর তিনি এক গ্লাস বরবন আর সোডা অর্ডার করলেন, সিগারেট ধরালেন। তারপর বিমানবালা ফ্লোরেন্স শ্যাফনার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার হাতে ধরিয়ে দিলেন একটা ছোট্ট নোট। প্রথমে শ্যাফনার ভেবেছিলেন, বোধহয় কোনো প্রেমের প্রস্তাব বা টেলিফোন নম্বর — পকেটে রেখে দিয়েছিলেন না পড়েই। তখনই কুপার ঝুঁকে এসে শান্ত গলায় বললেন, “মিস, নোটটা পড়ে দেখুন। আমার কাছে বোমা আছে।”

নোটে লেখা ছিল ঠিক তাই। শ্যাফনার বসতেই তিনি ব্রিফকেসটা খুলে দেখালেন — ভেতরে তারের গোছা আর লাল রঙের কয়েকটা কাঠি। তারপর পেশ করলেন তার দাবি।

দুই লাখ ডলার আর চারটি প্যারাসুট

কুপারের দাবি ছিল একেবারে সুনির্দিষ্ট: দুই লাখ ডলার নগদ — সব ২০ ডলারের নোটে, চারটি প্যারাসুট, আর সিয়াটলে নামার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির ট্রাক প্রস্তুত রাখতে হবে। আজকের হিসেবে ওই দুই লাখ ডলার প্রায় ১৫ লাখ ডলারের সমান। দাবি না মানলে বিমান উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি ছিল নোটে।

বিমান সিয়াটলের আকাশে চক্কর কাটতে লাগল, নিচে চলল তোড়জোড়। টাকা জোগাড় হলো, তবে কর্তৃপক্ষ কৌশলে সব নোটের সিরিয়াল নম্বর রেকর্ড করে রাখল। বিমান মাটিতে নামলে কুপার কথা রাখলেন — টাকা আর প্যারাসুটের বিনিময়ে ৩৬ জন যাত্রীকে ছেড়ে দিলেন। বিমানে রইলেন শুধু চার ক্রু আর কুপার।

তারপর শুরু হলো দ্বিতীয় অধ্যায়। কুপারের নির্দেশে বিমান আবার আকাশে উড়ল মেক্সিকো সিটির পথে, মাঝপথে রেনোতে জ্বালানি নেওয়ার কথা। তার শর্ত ছিল অদ্ভুত রকমের পেশাদার: বিমান উড়বে ১০ হাজার ফুটের নিচে, গতি থাকবে কম, আর পেছনের সিঁড়ি নামানো থাকবে। ক্রুদের তিনি ককপিটে ঢুকে দরজা বন্ধ করে থাকতে বললেন।

আকাশে লাফ

রাত আটটার পরের কথা। ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিমে ঘন জঙ্গল আর পাহাড়ের ওপর দিয়ে তখন বিমান যাচ্ছে, বাইরে ঝড়-বৃষ্টি আর কনকনে ঠান্ডা। ক্রুরা হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি টের পেলেন। ককপিটের ইন্ডিকেটরে দেখা গেল — পেছনের সিঁড়ি খুলে গেছে। রাত আনুমানিক ৮টা ১৩ মিনিটে, প্রায় ১০ হাজার ফুট উঁচু থেকে, অন্ধকার আকাশে টাকার ব্যাগ নিয়ে লাফ দিলেন ড্যান কুপার।

বিমান নিরাপদে রেনোতে নামল। পেছনের সিঁড়ি তখনো নামানো, কিন্তু কুপার নেই। রয়ে গেছে শুধু তার ফেলে যাওয়া ক্লিপ-অন টাই আর আটটা সিগারেটের শেষ অংশ।

৪৫ বছরের ‘নরজ্যাক’

এফবিআই এই মামলার নাম দিল ‘নরজ্যাক’ (NORJAK) — নর্থওয়েস্ট হাইজ্যাকিংয়ের সংক্ষিপ্ত রূপ। শুরু হলো আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম বড় অনুসন্ধান। যুদ্ধবিমান আকাশে টহল দিল, সেনা-পুলিশ চষে ফেলল ওয়াশিংটনের বিস্তীর্ণ জঙ্গল। কিন্তু কোথাও কিছু নেই — না মানুষ, না প্যারাসুট, না টাকা।

তদন্ত চলল টানা ৪৫ বছর। প্রথম পাঁচ বছরেই সন্দেহভাজনের তালিকায় নাম উঠল আটশ’র বেশি মানুষের, মামলার ফাইল দাঁড়াল ৬০ খণ্ডের বেশি। ক্রুদের বর্ণনা অনুযায়ী কুপার ছিলেন চল্লিশের মাঝামাঝি বয়সী, প্রায় ৬ ফুট ১ ইঞ্চি লম্বা, শান্ত, ভদ্র, ধীরস্থির — উচ্চারণে কোনো আঞ্চলিক টান নেই। জঙ্গলের ভূগোলও তিনি ভালো চিনতেন বলে মনে হয়েছে ক্রুদের। অনেকে ধারণা করেন, তার সামরিক বাহিনীতে প্যারাসুট লাফের অভিজ্ঞতা ছিল।

অবশেষে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে এফবিআই আনুষ্ঠানিকভাবে সক্রিয় তদন্ত বন্ধ করে দেয়। আমেরিকার বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের ইতিহাসে এটিই একমাত্র ছিনতাইয়ের ঘটনা, যার কোনো কিনারা হয়নি।

নদীর তীরে একমাত্র সূত্র

ঘটনার প্রায় নয় বছর পর, ১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারিতে হঠাৎ নড়ে ওঠে মামলাটা। কলম্বিয়া নদীর তীরে টেনা বার নামের জায়গায় পরিবারের সঙ্গে পিকনিকে গিয়েছিল আট বছরের বালক ব্রায়ান ইনগ্রাম। আগুন জ্বালানোর জন্য বালি খুঁড়তে গিয়ে সে পেয়ে যায় পচে যাওয়া নোটের তিনটি বান্ডিল। গোনা গেল প্রায় ৫ হাজার ৮০০ ডলার। সিরিয়াল নম্বর মিলিয়ে এফবিআই নিশ্চিত হলো — এগুলো কুপারকে দেওয়া সেই মুক্তিপণেরই টাকা।

কিন্তু এই আবিষ্কার রহস্য মেটাতে পারেনি, বরং বাড়িয়ে দিয়েছে। টাকা নদীর স্রোতে ভেসে এলো, নাকি কুপার নিজেই মাটিতে পুঁতে রেখে গিয়েছিলেন? লাফের পর তিনি কি নদীতে পড়েছিলেন? বাকি এক লাখ ৯৪ হাজার ডলারের বেশি অর্থের আজও কোনো হদিস নেই — একটা নোটও আর কোথাও খরচ হয়নি বলে জানা যায়। সম্প্রতি সেই উদ্ধার হওয়া ক্ষতিগ্রস্ত নোটগুলোর একটি নিলামে লাখ ডলারের বেশি দামে বিক্রি হয়েছে বলেও খবর এসেছে — রহস্যের প্রতি মানুষের কৌতূহল যে কমেনি, এ তারই প্রমাণ।

বেঁচে ছিলেন, নাকি মরেছিলেন?

পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারী, সাংবাদিক আর অসংখ্য শখের গোয়েন্দা। অনেক এফবিআই তদন্তকারীর অভিমত, কুপার ওই লাফে বাঁচতে পারেননি। যুক্তি শক্ত: রাতের অন্ধকার, ঝড়-বৃষ্টি, হাড়কাঁপানো ঠান্ডা, গায়ে সাধারণ পোশাক আর জুতো, অভিজ্ঞতাহীন কারও পক্ষে প্যারাসুট নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন — তার ওপর সঙ্গে ভারী টাকার ব্যাগ। লাফের এলাকাটা ছিল দুর্গম জঙ্গল ও নদী-নালায় ভরা।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় — বাঁচতে না পারলে লাশ গেল কোথায়? প্যারাসুটটাই বা হারাল কীভাবে? বিশাল তল্লাশিতেও একটা টুকরো কাপড় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আবার বেঁচে থাকলে টাকা খরচ হলো না কেন? বছর বছর ধরে অনেকে নিজেকে কুপার দাবি করেছে, মৃত্যুশয্যায় কেউ কেউ ‘স্বীকারোক্তি’ও দিয়েছে — কোনোটাই যাচাই করা যায়নি। সন্দেহভাজনদের তালিকায় নাম উঠেছে প্রাক্তন সৈনিক, পাইলট, এমনকি কুপারের অনুকরণে একই কায়দায় আরেকবার ছিনতাই করে ধরা পড়া এক ব্যক্তিরও — কিন্তু প্রমাণ মেলেনি কারও বিরুদ্ধেই।

যে নামটা ভুল থেকে জন্ম

আরেকটা মজার তথ্য — ‘ডি. বি. কুপার’ নামটাই আসলে ভুল। ছিনতাইকারী নিজের নাম বলেছিলেন ‘ড্যান কুপার’। তদন্তের শুরুতে এক সাংবাদিকের ভুল বোঝাবুঝিতে সংবাদে নাম ছাপা হয় ‘ডি. বি. কুপার’। ভুলটা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, আসল ছদ্মনামটাই হারিয়ে যায়, রহস্যমানব চিরকালের জন্য হয়ে যান ডি. বি. কুপার।

শেষ হয়েও শেষ নয়

কুপারের ঘটনার পর বিমান চলাচলে বড় পরিবর্তন আসে। বোয়িং ৭২৭-এর পেছনের সিঁড়িতে ‘কুপার ভেন’ নামের নিরাপত্তা লক বসানো হয়, যাতে আকাশে থাকা অবস্থায় সিঁড়ি খোলাই না যায়। বিমানবন্দরে যাত্রী যাচাই আর নিরাপত্তা তল্লাশির কড়াকড়ির শুরুও এই যুগ থেকেই।

এফবিআই মামলাটা বন্ধ করে দিয়েছে, তবে শর্ত একটাই — প্যারাসুট বা মুক্তিপণের টাকা সংক্রান্ত কোনো সত্যিকারের প্রমাণ পেলে তারা আবার ফাইল খুলবে। ওয়াশিংটনের গভীর জঙ্গলে, কোনো নদীর পলিমাটির নিচে, হয়তো আজও পড়ে আছে সেই উত্তরের বাকি অংশ।

আর ডি. বি. কুপার? বই, তথ্যচিত্র, সিনেমা আর টিভি সিরিজে তিনি বেঁচে আছেন এক অনন্ত রহস্য হয়ে — আকাশ থেকে লাফ দিয়ে অদৃশ্য হওয়া সেই মানুষটা, যাকে আজ পর্যন্ত কেউ খুঁজে পেল না।

— ফিচার ডেস্ক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ জাতীয় আরো খবর..

ফেসবুকে আমরা